কলমবিরতি-ঈদের ছুটিতে চাপে ব্যবসায়ীরা: বন্দরে জাহাজ জট, বেড়েছে খরচ
▪ কাস্টমসের কলমবিরতির পর ঈদের ১০ দিনের ছুটি
▪ ১৪ মে থেকে ১৪ জুন—৩১ দিনের মধ্যে মাত্র ৭টি কার্যদিবস
▪ পণ্য খালাসে বিলম্ব, জাহাজ জটে বাড়তি খরচের বোঝা আমদানিকারকদের ওপর
ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা ছুটির মধ্যে পড়ে গেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এর আগে কাস্টমস কর্মকর্তাদের টানা ১২ দিনের কলম ও কর্মবিরতির ফলে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার রেশ না কাটতেই এবার শুরু হচ্ছে ১০ দিনের সরকারি ছুটি। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে দেখা দিয়েছে কনটেইনার জট, বহির্নোঙরে দীর্ঘ সময় ধরে অলস পড়ে রয়েছে পণ্যবোঝাই জাহাজ।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত ১৪ মে থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ৩১ দিনের মধ্যে কেবল ৭ দিন পেয়েছেন কার্যদিবস হিসেবে। এই অল্প সময়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম, কাস্টমস শুল্কায়ন, পণ্য খালাস কিংবা রপ্তানিপণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব নয়। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে পণ্য খালাসে বিলম্ব, বহির্নোঙরে জাহাজ জট ও বন্দরের স্টোর রেন্ট। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের।
কাস্টমস সংস্কারে অস্থিরতা, শুরু সংকটের
গত ১২ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন করে দুটি নতুন বিভাগ গঠন করে সরকার। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১৪ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত কর্মবিরতিতে যান কাস্টমস কর্মকর্তারা। এতে কাস্টমস কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে, বন্ধ হয়ে পড়ে আমদানি-রপ্তানিপণ্য শুল্কায়ন।
চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরেই দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ হয়ে থাকে। ফলে কাস্টমসের অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণে।
জরিমানা-ভাড়ায় নাভিশ্বাস
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আবুল বশর বলেন, “চীন থেকে আমদানি করা আদা-রসুন বন্দরে আটকে আছে। শুল্কায়ন করতে না পারায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস হয়নি, অথচ স্টোর রেন্ট ও ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। এখন আবার বাজারেও দাম কম। ফলে আমদানি মূল্যের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।”
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কনটেইনারপ্রতি ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষতিপূরণের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
চারগুণ ডেমারেজ, লাফিয়ে বাড়ছে খরচ
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা কনটেইনার খালাসে প্রথম চার দিন ফ্রি টাইম দেওয়া হয়। এরপর প্রতিদিন নির্ধারিত হারে ভাড়া দিতে হয়। তবে গত ১০ মার্চ থেকে স্টোর রেন্টের উপর ডেমারেজ চারগুণ বাড়ানো হয়েছে। এখন ২০ ফুটের কনটেইনারে তৃতীয় ধাপে দৈনিক ১৯২ ডলার এবং ৪০ ফুটের কনটেইনারে দৈনিক ৩৮৪ ডলার পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে।
একইভাবে বহির্নোঙরে অলস বসে থাকা জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের দিতে হচ্ছে দৈনিক ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা।
অলস জাহাজের সারি
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে ৩৮ হাজার ৮৭২ টি কনটেইনার, যার মধ্যে খালি রয়েছে ৫ হাজার ২৬৬ টি। বন্দরে ও বহির্নোঙরে রয়েছে ১৪১টি জাহাজ, যার মধ্যে ৭৯টি জাহাজ কোনো কার্যক্রম ছাড়াই অলস পড়ে আছে।
‘অপেক্ষাকৃত সময়েই ক্ষতি’
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি খায়রুল কবির সুজন বলেন, “কাস্টমস কর্মবিরতি, বৃষ্টির কারণে বিলম্ব, এখন আবার টানা ছুটি—সবকিছু মিলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঁচামাল বা পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতে।”
তিনি আরও বলেন, “সব সরকারি দফতর বন্ধ থাকলে কাস্টমস শুল্কায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা নথি পাওয়া যায় না। ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
বিজেএমইএর উদ্বেগ
রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পও এই সংকট থেকে বাদ যায়নি। বিজেএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “ডেমারেজ চারগুণ হয়েছে, কিন্তু কর্মবিরতির কারণে সময়মতো শুল্কায়ন করা যায়নি। আমরা ডেমারেজ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি।”
কী করণীয়?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি ছুটির সময় কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অন্যথায় বারবার এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন উদ্যোক্তারা।