আজকের পৃথিবীতে, শক্তির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং একই সাথে, টেকসই শক্তির সন্ধানে ক্রমাগত গবেষণা চলছে। এই তিনটি প্রাকৃতিক উৎস - সূর্য, জল এবং বাতাস - এর মধ্যে বায়ু শক্তির একটি অক্ষয় উৎস। আজকের পৃথিবীতে, মানুষ বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে বিশাল বায়ু টারবাইন তৈরি করেছে, যা নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত। মানুষ বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে দিগন্ত জুড়ে বিশাল বায়ু টারবাইন তৈরি করেছে, কিন্তু আমরা কি কখনও কল্পনা করেছি, যে যখন সেই বাতাস কেবল একটি কাঠামোকে কম্পিত করে, তখন সেই বাতাসের সূক্ষ্ম শব্দহীন কম্পনকে মুক্ত শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব?
ঐতিহাসিক বিপর্যয়: যে ধ্বংস থেকে উঠে এল ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তি
১৯৪০ সালের ৭ নভেম্বর—ওয়াশিংটনের টাকোমা সেতু (Tacoma Narrows Bridge) প্রকৌশল ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে। তীব্র বাতাসের ধাক্কায় সেতুটি দোলাতে দোলাতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাকে বলা হয় aeroelastic flutter catastrophe—বাতাস ও কাঠামোর পারস্পরিক কম্পন-প্রতিক্রিয়া, যা নিয়ন্ত্রণহীন রেজোন্যান্স তৈরি করে। প্রকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি ছিল নকশার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল কারণ সেতুটির অ্যারোডাইনামিক স্থিতিশীলতা কম ছিল।
যদিও এটি ছিল একটি শোকাবহ দুর্ঘটনা, প্রকৌশলী ও গবেষকদের কাছে এটি রেখে গিয়েছিল এক গভীর-প্রশ্ন!
এই কম্পন শক্তিকে কি নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজে লাগানো সম্ভব?
দশকের পর দশক পর সেই উত্তর এসেছে স্পেনের প্রতিষ্ঠান Vortex Bladeless-এর হাত ধরে।
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে স্পেনের একটি সংস্থার হাতে, যারা তৈরি করেছে ভর্টেক্স ব্লেডলেস উইন্ড টারবাইন (Vortex Bladeless Wind Turbine বা VBWT)। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যেখানে নেই কোনো বিশাল ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণ, নেই কোনো শব্দদূষণ বা পাখির প্রাণহানির ভয়। প্রচলিত টারবাইনে ঘূর্ণনশক্তি ব্লেডের মাধ্যমে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই উদ্ভাবনটি শহুরে এলাকা, হাইওয়ে বা সাধারণ ভবনের ছাদেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, যেখানে সোলার প্যানেলের মতো কম গতির বাতাসেও বিদ্যুৎ শক্তি আহরণ সম্ভব। এটি শব্দবিহীন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, এবং কোনো ব্লেড বা পাখা না থাকায় পাখিদের জন্যও নিরাপদ। এই প্রযুক্তিতে শুধু মাত্র বাতাসের কম্পন ব্যবহার করে ভাইব্রেশনাল মেকানিক্যাল এনার্জি (Vibrational Mechanical Energy)-কে সরাসরি বৈদ্যুতিক শক্তিতে (Electrical Energy) রূপান্তর করা হয়।
ভর্টেক্স ব্লেডলেস টারবাইনের কার্যকৌশল
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল: কম্পন আহরণের রহস্য
VBWT-এর কেন্দ্রে রয়েছে ভর্টেক্স-প্ররোচিত কম্পন (Vortex-Induced Vibration বা VIV) নীতি। এখানে ঘূর্ণন নয়, বরং দোলনই শক্তির উৎস।
যখন বাতাস এর লম্বা, নমনীয় থাম বা মাস্ট (Mast)-এর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এর দুই পাশে বাতাসের ঘূর্ণি (Vortex Shedding) সৃষ্টি হয়। এই ঘূর্ণি স্তম্ভটিকে ক্রমাগত ধাক্কা দেয়, যার ফলে স্তম্ভটি কম্পিত হতে শুরু করে। স্তম্ভটি তৈরি করা হয় হালকা ও নমনীয় ফাইবারগ্লাস বা কার্বন ফাইবার দিয়ে, যাতে এটি সহজে ও দ্রুত কম্পিত হতে পারে।
প্রকৌশলের মূল চ্যালেঞ্জ হলো গাণিতিক মডেলিং এবং সূক্ষ্ম নকশার মাধ্যমে এই কম্পনকে বাতাসের গতির সঙ্গে রেজোন্যান্স (Resonance) ফ্রিকোয়েন্সিতে ধরে রাখা, যাতে সর্বোচ্চ শক্তি আহরণ সম্ভব হয়।এই কম্পন থেকে শক্তি আহরণের জন্য এর ভেতরে যুক্ত থাকে একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক জেনারেটর, যা কম্পনকে (ভাইব্রেশনাল মেকানিক্যাল এনার্জিকে) সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: এই জেনারেটরে মাইকেল ফ্যারাডের উদ্ভাবিত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন (তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ) প্রক্রিয়া কাজ করে। ইলেকট্রিক কয়েল ও চৌম্বকীয় ফ্লাক্স কাটিং-এর মাধ্যমে বাতাসের কম্পনেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা ভর্টেক্স ব্লেডলেস উইন্ড টারবাইনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল ভূমিকা রাখে।
আমার গবেষণা যাত্রা: UTHM-এ এক নতুন উদ্ভাবন
এই প্রযুক্তির ধারণাগত সফলতা থাকলেও, কম বাতাসের গতিতে এর ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য এর দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য ছিল। মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি তুন হুসেইন ওন মালয়েশিয়া (UTHM)-এর মেকানিক্যাল এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির অধীনে, আমার তত্ত্বাবধায়ক ড. সোফিয়ান বিন মহম্মদ- যিনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এয়ারক্রাফট সিস্টেম এবং ডিজাইন রিসার্চ ফোকাস গ্রুপের প্রধান, তাঁর অভিজ্ঞতা এই গবেষণাটিকে সঠিক পথে চালিত করে; তাঁর নির্দেশনায় স্নাতক (অনার্স) অন্তিম বর্ষের প্রকল্প হিসেবে আমি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি।
যন্ত্রপ্রকৌশলী হিসেবে আমার মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করা রেজোন্যান্স অদক্ষতা দূর করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যার উচ্চতা হবে ২ মিটার এবং যা বাসা বাড়ির ছাদে, ছোট জায়গায় বা হাইওয়েতে সহজে স্থাপন করা যাবে। বিশেষ করে কম বাতাসের গতিতে (Low Wind Operation)। এই গবেষণায় আমার প্রধান কাজগুলো ছিল:
• প্রোটোটাইপ নির্মাণ: ২-মিটার উচ্চতার নমনীয় কাঠামো তৈরি ও তার অ্যাসেম্বলি।
• প্যারামিটার গবেষণা: বাতাসের গতি, কম্পন ফ্রিকোয়েন্সি এবং রেজোন্যান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারগুলো বিশ্লেষণ ও অপটিমাইজ করা।
• বৈদ্যুতিক সিস্টেম তৈরি: ইলেকট্রোম্যাগনেটিক জেনারেটরের নকশা তৈরি ও ইনস্টল করা, যাতে বাতাসের কম্পনে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।
আমরা দুটি প্রধান পরিবর্তন সাধন করি:
নমনীয় রডের উন্নতি: কম বাতাসের গতিতেও সহজে কম্পন শুরুর জন্য রডের উপাদানের দৃঢ়তা (Stiffness) হ্রাস করা হয়।
তড়িৎচৌম্বকীয় শক্তি উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে জেনারেটরের কপার কয়েলের ডিজাইন উন্নতি।

উইন্ড টানেল পরীক্ষায় VBWT প্রোটোটাইপ – কম গতির বাতাসেও শক্তি আহরণের দক্ষতা যাচাই, Aerodynamics Lab UTHM।
বিপ্লবী ফলাফল
এই প্রকৌশলগত পরিবর্তনের ফল ছিল অবিশ্বাস্য। আমাদের প্রোটোটাইপটি পরীক্ষায় দেখায় যে এটি কম বাতাসের গতিতেও ১.৪৮ W বৈদ্যুতিক শক্তি এবং ৩.৫-Watt গতিশক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম। এই দক্ষতা পূর্ববর্তী ডিজাইনের তুলনায় বেশি! এই ফলাফল প্রমাণ করে যে VBWT এখন শহুরে পরিবেশে এবং কম বাতাসযুক্ত এলাকায় ব্যবহারিক কার্যকর শক্তি আহরণ সম্ভব নবায়নযোগ্য শক্তি অ্যাপ্লিকেশনগুলির জন্য একটি শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প।, যা বাংলাদেশের মতো মধ্যম বাতাসযুক্ত দেশে বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র খুলে দেয়
ভবিষ্যতের জন্য নিখুঁত সমাধান: শহুরে শক্তি বিপ্লব
VBWT-এর Prototype নকশা এটিকে শহুরে পরিবেশ, স্মার্ট সিটি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক অপরিহার্য সমাধান করে তুলেছে। এর সুবিধাগুলো চিরাচরিত বায়ুশক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করে:
o জিরো মেইনটেন্যান্স ও কম খরচ: যেহেতু এতে কোনো ঘূর্ণনশীল ব্লেড বা গিয়ারবক্স নেই, তাই যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি হয় না। ফলে এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় শূন্য এবং নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম উপাদান ব্যবহার হওয়ায় উৎপাদন খরচও হ্রাস পায়।
o নীরব ও নিরাপদ: এটি সম্পূর্ণ শব্দবিহীনভাবে কাজ করে, যা আবাসিক এলাকা বা কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি স্থাপনের জন্য আদর্শ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্লেড না থাকায় এটি পাখিদের জন্য শতভাগ নিরাপদ।
o শহুরে প্রয়োগের নমনীয়তা: এর ছোট আকার, কমপ্যাক্ট ডিজাইন এবং উল্লম্ব স্থাপনার বৈশিষ্ট্য এটিকে ভবনের ছাদ, হাইওয়ে পাশে, রাস্তার বাতি বা টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ারে সহজে স্থাপন করার সুযোগ দেয়। এটি স্মার্ট গ্রিড এবং গ্রামীণ এলাকার ছোট আকারের বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নিখুঁত সমাধান।
o টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG): এই উদ্ভাবন পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস, শক্তি সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (বিশেষ করে SDG ৭, ১১, ১২, এবং ১৩) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের শক্তি সংগ্রহ হবে নীরব, স্মার্ট ও টেকসই—ঠিক যেমন ভর্টেক্স ব্লেডলেস টারবাইন। এই প্রযুক্তি আমাদের শেখায় যে, প্রকৌশলের তথাকথিত ব্যর্থতা বা প্রকৃতির আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর শক্তিকেও উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক কৌশলের মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব। টাকোমা সেতুর ট্র্যাজেডি আজ ব্লেডহীন বিদ্যুৎ বিপ্লবের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।