ভিয়েতনাম পারলে আমরা কেন নয়?—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির আহ্বান
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরো বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক আলোড়ন তুলেছেন। তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করতে শুরু করেছে। এর ফলে শুরু হয়েছে এক ধরনের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ, যা ইতোমধ্যেই বহু দেশের অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও।
বিশেষ করে যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, সেসব দেশের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাব পড়েছে সরাসরি। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অনেক দেশও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এতে করে গড়ে উঠেছে এক বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন বাণিজ্য নীতির পূর্বাভাস আগেই ছিল, বিশেষ করে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ক্ষেত্রে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো—নেটোর সদস্য, প্রতিবেশী এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু কানাডাকেও ছাড় দেননি তিনি। বাংলাদেশও বাদ যায়নি তার লক্ষ্য থেকে, যদিও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হলো তৈরি পোশাক, যার প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যেকোনো শুল্ক বৃদ্ধি সরাসরি আমাদের রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন কিছু সময়ের জন্য শুল্ক আরোপ স্থগিত রাখলেও এই “বাণিজ্যযুদ্ধ বিরতি” দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না, তা অনিশ্চিত। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম, চীন, এমনকি ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক অগ্রগতি করেছে।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সফল বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করে শুল্কহার ৪৬% থেকে কমিয়ে ২০% এবং তৃতীয় দেশের পণ্যের ক্ষেত্রেও ৪০% নির্ধারণ করিয়েছে। ফিলিপিন্স ইতোমধ্যে একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে, এবং ইন্দোনেশিয়াও আলোচনার শেষ পর্যায়ে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে—ভিয়েতনাম পারলে বাংলাদেশ কেন নয়?
আমরা এখনো সরকারি আলোচনা ও কূটনৈতিক চিঠিপত্র চালাচালির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। এতে করে বাংলাদেশের পোশাক খাত মারাত্মক চাপে পড়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা বিকল্প বাজার হিসেবে এই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন।
সম্ভাব্য করণীয়:
এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত কিছু পদক্ষেপ, যেমন—
পোশাক খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের যুক্ত করে একক টাস্কফোর্স গঠন
মার্কিন আমদানিকারক ও ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন
প্রয়োজন হলে পেশাদার লবিইস্ট নিয়োগ
মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে শুল্ক ছাড়ের সুযোগ তৈরি
দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি কৌশলগত লড়াই, যার মোকাবিলা কৌশল দিয়েই করতে হবে।
লেখক: সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা