যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘আমেরিকার পরাজয়’ বলছে তেহরান
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের অবসানে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরান। বুধবার (২৪ জুন) তেহরানের পক্ষ থেকে এ মন্তব্য করা হয়, যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শুরু করেছেন।
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতা কোনো চাপ বা জবরদস্তির ফল নয়; বরং এটি ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ় অবস্থানের ফলাফল। তার দাবি, এই চুক্তি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যর্থতার স্বীকৃতি।
গত কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ চলাকালে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে চাপ সৃষ্টি করে এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সংঘাতের প্রভাব পড়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছায়, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে নতুন কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে চুক্তিকে ঘিরে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে সফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
গালিবাফ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এই অঞ্চলের দেশগুলোরই। বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে উপসাগরীয় অঞ্চলে সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরের অংশ হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রুবিও জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে সম্ভাব্য টোল আরোপের বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রুবিও বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ একতরফাভাবে টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না এবং যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ মেনে নেবে না।
এদিকে ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি সহযোগিতার বার্তা দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যৎ সংঘাত নয় বরং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহাবস্থানের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। একই সঙ্গে লেবাননে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠাকে বৃহত্তর সমঝোতা প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যদিও দেশটির অভ্যন্তরে আলোচনা নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবুও তা পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার মতো শক্তিশালী নয়।
এদিকে পাকিস্তান জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে। আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের প্রশ্নে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবেই। কেবল সময়ের ব্যবধান নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু পরিদর্শন অনিবার্য।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।