বুধবার , ০৭ অক্টোবর ২০২৬
বুধবার , ০৭ অক্টোবর ২০২৬
হোম › জাতীয় › জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় জীবনে বিপর্যয়: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় চরম মানবিক সংকটের চিত্র

জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় জীবনে বিপর্যয়: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় চরম মানবিক সংকটের চিত্র

favicon
অনলাইন সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় জীবনে বিপর্যয়: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় চরম মানবিক সংকটের চিত্র

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই অঞ্চলের মানুষ জীবিকা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের তীব্র অভাবে ভুগছেন। অনেকে জীবিকার অভাবে ও ঘরবাড়ি হারিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন— যা নতুন এক মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এডুকো ও উত্তরণ সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত একটি প্রকল্পের অংশ। গবেষণার আওতায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়ন, এবং সাতক্ষীরা পৌরসভার পাঁচটি বস্তি এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


গবেষণায় দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধান ও চিংড়ি খামার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উপকূলে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকেই ভাত ও ডালের বাইরে অন্য কিছু খেতে পারছেন না। কর্মসংস্থানের অভাবে পুরুষরা বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরে কাজ করতে যান, ফলে নারী-প্রধান পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে।


পানি ও স্যানিটেশন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। নিরাপদ পানির অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে নারী ও মেয়েরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে জরায়ুজনিত (৬০–৭৪%) ও প্রজননজনিত (৪৫–৬৬%) সমস্যা ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্বল নদী বাঁধও এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।


উপকূল থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক পরিবার শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে, কিন্তু সেখানেও তারা দারিদ্র্য, পানি সংকট ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যায় জর্জরিত। অল্প আয়ের এসব মানুষ অপর্যাপ্ত টয়লেট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছেন। ফলে শিশুদের স্কুলছুট ও শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক পরিবার সরকারি খাস জমিতে বসবাস করায় উচ্ছেদের ভয়েও দিন কাটাচ্ছেন।


গবেষক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন,


“জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলের মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছেন, কিন্তু দুই জায়গাতেই তারা বিপর্যয়ের শিকার। উপকূলে লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের অভাব, আর বস্তিতে দারিদ্র্য ও জলাবদ্ধতা— দুটোই সমান সংকট।”


তিনি আরও বলেন,


“সমাধান হিসেবে উপকূলে লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি নগর বস্তিতে নগদ অর্থ নয়, বরং উপকরণ সহায়তা ও শিশুশিক্ষা সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।