জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা: সরকারের বিরুদ্ধে একজোট প্রায় সব দল
স্বৈরাচারবিরোধী জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। দলগুলো বিশ্বাস করেছিল, সরকার বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে দায়িত্ব শেষ করবে।
কিন্তু মাত্র ১৫ মাসের মাথায় সেই সমর্থন ভেঙে পড়েছে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের’ অভিযোগ তুলেছে, বিশেষ করে ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে। এতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।” জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির আহ্বান জানান। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না অভিযোগ করেন, “অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।”
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নামের কোনো ধারা থাকা উচিত নয়; সংবিধান সংস্কার বিষয়ে যা ঐকমত্য হয়েছে, সেটাই গণভোটে যেতে হবে।” বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না; আমরা শুধু নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের সমর্থন দিয়েছি।”
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মন্তব্য করেন, “বারবার স্বৈরাচার সরিয়েও আমাদের ভেতর থেকেই নতুন স্বৈরাচার জন্ম নেয়।” গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, “জুলাই সনদের নামে রাজনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে পারে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লব দেশের রাজনীতিতে একসময় নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু এখন ঐক্যের জায়গায় ফের এসেছে সন্দেহ ও বিভক্তি। বিএনপি চায় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হোক, জামায়াত চায় নভেম্বরে আলাদা গণভোট, আর এনসিপি চায় জাতীয় ভোটের আগে গণভোট সম্পন্ন করা। এই অবস্থানগত পার্থক্য সোশ্যাল মিডিয়ায় “হ্যাঁ-না” প্রচারণায়ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজেও সম্প্রতি বলেছেন, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হতে পারে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার সঠিক সমাধান না হলে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।”
প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন, “গণভোট ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে নির্বাচন ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই অনুষ্ঠিত হবে।”
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে অনৈক্য, আর ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা হয়ে উঠছে দেশের প্রধান আলোচ্য বিষয়।