জুলাই আন্দোলনের পরও থামেনি দুর্নীতি: এনসিপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়েছিল—উচ্চপর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটে। বড় নেতাদের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের অনেকেই অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হন। এমনকি জেলা পর্যায়ের ছাত্রলীগ নেতার ব্যাংক হিসাবেও হাজার কোটি টাকা থাকার মতো বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া যায়। এই দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতির প্রতিবাদেই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল জুলাই আন্দোলনে।
তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেই স্বপ্ন মাত্র ১৫ মাসেই ম্লান হয়ে গেছে। কারণ, পাঁচ আগস্টের পরও দেশের রাজনীতি থেকে দুর্নীতি দূর হয়নি—বরং নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে।
গত পনেরো মাসে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির কয়েকজন মাঠপর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ পাওয়া গেছে, তেমনি সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলো এসেছে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের গড়া সংগঠন এনসিপির বিরুদ্ধে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ৩১টি মেহগনি গাছ কাটার অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল হাসান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন। দল হিসেবে বিএনপি এসব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সহস্রাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তি প্রয়োগ করেছে।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে এনসিপিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ঝড়। মাত্র নয় মাস বয়সী দলটি বিতর্কে জর্জরিত।
এনসিটিবির পাঠ্যবই মুদ্রণের কাগজে ৪০০ কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে এনসিপির আলোচিত নেতা গাজি সালাউদ্দিন আহমেদ তানভীরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। পরে তানভীরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আরেক নেতার হঠাৎ বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়—যারা কিছুদিন আগেও টিউশনি করতেন, তারা কীভাবে দামি গাড়ির মালিক হলেন—এই প্রশ্ন এখন ব্যাপক আলোচনায়।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় সংগঠক আজিজুর রহমানকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, ‘মামলা–বাণিজ্যের’ একটি কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর। অন্যদিকে বগুড়ায় এনসিপির উপজেলা সমন্বয়ক সাইফুল ইসলাম বুলবুলের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী আবদুল মান্নান। টাকা ফেরত না পাওয়ায় দেওয়া চেক ব্যাংক থেকে ডিজঅনার হয়।
এনসিপির বিরুদ্ধে দেশে প্রায় প্রতিদিনই নানা অভিযোগ উঠছে। যারা রাজনীতিতে শুদ্ধতার অঙ্গীকার করেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই তারাই যেন আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে উঠেছেন—এমন মন্তব্য এখন সাধারণ মানুষের।
শুধু এনসিপি ও বিএনপি নয়, নূরের গণঅধিকার পরিষদসহ আরও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলকেও ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পাঁচ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টালেও রাজনীতির দুর্নীতিগ্রস্ত চিত্র অনেকটাই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
(সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)