মঙ্গলবার , ০৬ অক্টোবর ২০২৬
মঙ্গলবার , ০৬ অক্টোবর ২০২৬
হোম › জাতীয় › নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ: পাঁচ বছরে অভিযোগ প্রায় ২ লাখ, বাড়ছে আর্থিক প্রতারণা

নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ: পাঁচ বছরে অভিযোগ প্রায় ২ লাখ, বাড়ছে আর্থিক প্রতারণা

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ: পাঁচ বছরে অভিযোগ প্রায় ২ লাখ, বাড়ছে আর্থিক প্রতারণা

দেশে সাইবার অপরাধ দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাড়ছে অভিযোগের সংখ্যা, বাড়ছে ভুক্তভোগীও। প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে সংঘবদ্ধ সাইবার চক্র।


পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা ডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে। শুধু চলতি বছরেই ডিবির কাছে জমা পড়েছে প্রায় ৫ হাজার অভিযোগ, যার অধিকাংশই আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত।


ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী অপরাধ দমনে কাজ চলছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সাইবার অপরাধ কমাতে জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”


সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ জন সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছেন। গত ছয় মাসে সাইবার পুলিশ সেন্টারে যোগাযোগ করেছেন ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগী। সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান, অনলাইন ও ভেরিফায়েড পেজে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।


ডিবিতে জমা পড়া অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের টার্গেট করছে সাইবার চক্র। তারা মোবাইল ফোনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ চুরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন পুলিশ বা প্রশাসনের কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে মামলা করার ভয় দেখানো বা মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রতারণার কাজে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ভুয়া ছবিও ব্যবহার করছে অপরাধীরা।


পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সাইবার চক্র আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও বেপরোয়া। অপরাধীরা প্রথমে ভুক্তভোগীর স্মার্টফোনের কল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস পরিবর্তন করে। এরপর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য বদলে পাসওয়ার্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অর্থ তুলে নেয়।


সম্প্রতি ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে দুর্জয় নামে এক সাইবার অপরাধী স্বীকার করেছে, সে বিভিন্ন নম্বর থেকে অপরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করে কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করত এবং পরে আর্থিক প্রতারণা চালাত।


সিআইডি সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে সাইবার পুলিশ সেন্টারে যোগাযোগ করা ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ১ হাজার ৮১৩ জন অনলাইন আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ই-কমার্স প্রতারণার শিকার ৭৪৩ জন, ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাপে পড়েছেন ৫৪৪ জন, লোন ফাঁদে ৬৪ জন এবং বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন ১১৫ জন। এ ছাড়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইলিং, সিম ক্লোন, ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ২ হাজার ৫৫২ জনকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে।


অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশ-বিদেশ থেকে পরিচালিত সাইবার অপরাধ বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এসব অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সচেতন ও সহায়তা করা জরুরি।


এদিকে আমেরিকান সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডিয়ান্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ৫৫ শতাংশ সাইবার হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক লাভ। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের উপপরিচালক তাপসী রাবেয়া জানান, শহরের উচ্চশিক্ষিত অনেক মানুষ অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হলেও তাদের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ আইনের আশ্রয় নিতে চান না।


সম্প্রতি সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের তথ্যে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছেন, যা মোট ভুক্তভোগীর মাত্র ১২ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং ৬০ শতাংশ নারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহারও সাইবার অপরাধ বৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।


পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত সাইবার অপরাধের ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশই আর্থিক প্রতারণা, এবং প্রতি বছর অপরাধের সংখ্যা ও ধরন—দুটোই বাড়ছে।