পুতুল থেকে বাংলাদেশের আপসহীন নেতা পর্যন্ত
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়েই ছিল তার সংসার। তার জন্মনাম ছিল খালেদা খানম। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘পুতুল’ নামে।
১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘খালেদা জিয়া’ নাম গ্রহণ করেন বলে জানিয়েছেন তার বড় বোন সেলিমা ইসলাম। তবে রাজনীতিতে প্রবেশের পরই তিনি এই নামেই সর্বজনপরিচিত হয়ে ওঠেন।
সেলিমা ইসলাম জানান, সে সময় খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনাই ছিল না। এমনকি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। তার মৃত্যুর পর বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয় এবং অনেক নেতা সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সঙ্গে আপসে জড়ান। এতে দলটি চরম সংকটের মুখে পড়ে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। পরের বছর, ১৯৮৪ সালের ১০ মে, তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও বিএনপির সাবেক নেতা অলি আহমেদ জানান, দলকে টিকিয়ে রাখার তাগিদেই নেতাদের অনুরোধে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। উল্লেখ্য, তখন দেশজুড়ে চলছিল জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন।
বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর ১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়া সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচ দলীয় জোটও আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। তবে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের জোট এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট তা বর্জন করে রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে যায়।
এই আপোষহীন অবস্থানের কারণেই খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাকে তিনবার গ্রেপ্তার করা হয়।
দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
ওই নির্বাচনে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়ী হন খালেদা জিয়া—যা তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা