ব্রাজিলের নির্বাচনে বড় ইস্যু ট্রাম্প, দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়েও ভোটারদের উদ্বেগ
দুর্নীতি, অপরাধ, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি—সব মিলিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। নির্বাচনে ভোটারদের সামনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বামপন্থি বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। দ্বিতীয়জন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচন শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থানও প্রভাবিত করতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, ব্রাজিল কি ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পথে এগোবে, নাকি লুলার অনুসৃত বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত রাখবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই।
লুলার প্রত্যাবর্তন, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও
৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দেশ শাসনের পর ২০২৩ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে তাঁকে ৫৮০ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করে এবং রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়। পরের বছর নির্বাচনে জইর বলসোনারোকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হন লুলা।
এবার তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো। বাবার রাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। জইর বলসোনারো বর্তমানে অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে দেওয়া ২৭ বছরের কারাদণ্ডের মধ্যে রয়েছেন। স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি মানবিক বিবেচনায় গৃহবন্দি আছেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।
লুলা ও ফ্লাভিওর বাইরে আরও চারজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অগুস্তো কুরি, রোনালদো কাইয়াদো, রেনান সান্তোস ও রোমেউ জেমা।
জনমত জরিপে এগিয়ে লুলা
নির্বাচনের প্রথম দফার আগে প্রকাশিত কয়েকটি জনমত জরিপে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন লুলা। সিএনটির এমডিএ পরিচালিত জরিপে বৈধ ভোটের হিসাবে লুলার সমর্থন ছিল ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ফ্লাভিও বলসোনারোর সমর্থন ছিল ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।
জরিপে অগুস্তো কুরি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, রোনালদো কাইয়াদো ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, রেনান সান্তোস ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং রোমেউ জেমা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সমর্থন পান।
দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লুলার সমর্থন ছিল ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৭ জনের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে ভুলের সম্ভাব্য সীমা ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
ট্রাম্পের নীতিতে লুলার রাজনৈতিক সুবিধা?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে লুলা বহুপাক্ষিকতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে চীন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও ব্রাসিলিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন বেড়েছে। ব্রাজিলের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং দেশটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দুই দেশের বিরোধের অন্যতম কারণ।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এ সিদ্ধান্তের পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান বিচারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখার বিষয়টিও উঠে আসে। পরে নভেম্বরে শুল্কের কিছু অংশ প্রত্যাহার করা হলেও চলতি গ্রীষ্মে কয়েকটি ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়।
এর জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন লুলা। তবে সেপ্টেম্বরে সিএনএনের সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান আমানপুরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলায় আপাতত পাল্টা পদক্ষেপ স্থগিত রাখবেন।
বিশ্লেষক ব্রায়ান উইন্টারের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ব্রাজিলের রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে লুলার জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে লুলা বলেন, ‘ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান নয়।’ দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে অবস্থান নেওয়া ব্রাজিলীয় রাজনীতিকদেরও সমালোচনা করেন তিনি। বক্তব্যটি ফ্লাভিও বলসোনারোকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়।
ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও মিলেইয়ের সঙ্গে ফ্লাভিওর ঘনিষ্ঠতা
লুলার বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লুলার সঙ্গে মতবিরোধ থাকা অন্যান্য নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
গত জুলাইয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ফ্লাভিওকে সমর্থন জানান। এর আগে মে মাসে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে ওভাল অফিসে বৈঠক করেন তিনি। সেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ, শুল্কনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও বৈঠক করেন ফ্লাভিও।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও ফ্লাভিওর ঘনিষ্ঠ মিত্র। জুলাইয়ে ব্রাজিল সফরে গিয়ে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার প্রতি সমর্থন জানান মিলেই। এ সময় লুলাকে ‘দণ্ডিত অপরাধী’ এবং তাঁর সরকারকে ‘চোর’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর জেরে ব্রাজিল বুয়েনস আইরেস থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে।
লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও প্রভাবের আশঙ্কা
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের মধ্যে ব্রাজিলের এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হলে অঞ্চলটিতে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে, লুলা জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন সত্ত্বেও চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এই নির্বাচন দেশটির অর্থনীতি, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।